বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আজ ভয়াবহ সামাজিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও নির্মম হত্যার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। মিরপুরের রামিসা, ঠাকুরগাঁওয়ের লামিয়া, সিলেটের ফাহিমা কিংবা মুন্সীগঞ্জের শিশুহত্যার মতো ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, বিচারহীনতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অপরাধীরা এখন ধর্ষণের পর শিশুদের হত্যা করছে, যেন কোনো সাক্ষী জীবিত না থাকে। এটি এমন এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা, যেখানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে শিশুরা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাংলাদেশে আজ শিশুরাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশ্ন জাগে: কেন অপরাধীরা এত ভয়ংকর হয়ে উঠছে? কেন তারা আইনের ভয় পাচ্ছে না? কেন বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটার পরও কার্যকর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট সামনে চলে আসে।
বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দেশে বহু আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। ফলে অপরাধীরা বুঝে যায়—এই দেশে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। আইন যখন দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে কার্যকর হয় না, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্র বারবার কঠোর আইনের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই সীমিত। মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণ কমছে না। কারণ অপরাধীরা জানে, মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে, সাক্ষ্য নষ্ট হবে, প্রভাবশালীরা রক্ষা করবে, আর সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে সব ভুলে যাবে। ফলে আইন কাগজে কঠোর হলেও বাস্তবে তা দুর্বল ও অকার্যকর।
এছাড়া প্রশাসনিক অবহেলাও বড় কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার থানায় গিয়ে হয়রানির শিকার হয়। কোথাও মামলা নিতে অনীহা, কোথাও রাজনৈতিক চাপ, কোথাও সামাজিক ভয়—সব মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে জনগণের মনে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।
নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক সংকট
রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পাশাপাশি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ও শিশু নির্যাতনের জন্য দায়ী। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামো থেকে মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থ, ভোগবাদ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় মানুষ মানবিকতা ভুলে যাচ্ছে। শিশুদের প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ কমে যাচ্ছে।
পাশাপাশি মাদক, পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীল সংস্কৃতির বিস্তার তরুণ সমাজের একাংশকে বিকৃত মানসিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাব যৌন সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অথচ এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই বললেই চলে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দায়হীনতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও দায়হীনতার প্রবণতা স্পষ্ট। কোনো বড় ঘটনা ঘটলেই কিছুদিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তারপর সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। সরকার প্রায়ই উন্নয়ন, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর সাফল্যের কথা বললেও মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন নারী ও শিশুরা নিরাপদ থাকে।
দুঃখজনকভাবে অনেক সময় শিশু নির্যাতনের ঘটনাও রাজনৈতিক বক্তব্য ও দোষারোপের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন, তা অনুপস্থিত। ফলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকে।
করণীয় ও প্রতিকার
প্রথমত, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত ও রায় কার্যকর করতে হবে। বিচার বিলম্বের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো থানায় মামলা নিতে গড়িমসি বা অবহেলা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, মাদক ও পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাতে হবে। শুধু সাময়িক অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম ও নৈতিকতা, মানবিকতা ও যৌন সচেতনতা বিষয়ক কার্যকর শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিশুদের আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
পঞ্চমত, সমাজকে নীরবতা ভাঙতে হবে। প্রতিবাদকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ না রেখে সংগঠিত সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে একসঙ্গে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিটি ঘটনা রাষ্ট্র ও সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একটি দেশ তখনই সভ্য দাবি করতে পারে, যখন তার শিশুরা নিরাপদ থাকে। কিন্তু আজ বাংলাদেশে শিশুরা ভয়, সহিংসতা ও অনিরাপত্তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। এটি কেবল অপরাধীর দায় নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং সমাজ—সবকিছুর সম্মিলিত ব্যর্থতা।
শুধু শোক প্রকাশ বা সাময়িক ক্ষোভ দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক প্রতিরোধ। অন্যথায় আরও অসংখ্য রামিসা, লামিয়া ও ফাহিমার করুণ মৃত্যু আমাদের বিবেককে বারবার রক্তাক্ত করবে।
