শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬,
২১ ফাল্গুন, ১৪৩২, ১৬ রমজান, ১৪৪৭

সর্বশেষ প্রকাশিত

Copyright © 2025. All Right Reserved.

সময়ের আপেক্ষিকতা, আলোর গতি ও মেরাজ তত্ত্ব

Share It:

মোহাম্মদ নিজাম উদ্দীন

সময়ের পরিক্রমায় আমাদের জ্ঞানের পরিধি ও ধারণার পরিবর্তন, পরিবর্ধন এক ধ্রুব সত্য বিষয়। সত্য ধ্রুব হলেও ঘটনা কিন্তু আপেক্ষিক। এই ধরুন আমরা জানি, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে আর সন্ধ্যায় পশ্চিমে অস্ত যায়। আসলে কি তাই ? না তা ঠিক নয়। সত্যি কথা হলো, সূর্য কোথাও ওঠেও না আবার নামেও না। সে তার নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বরং পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘোরার কারণে আমরা সূর্যের ওঠা-নামা দেখি।

শিরোনামে সময়ের কথা বলা হয়েছে। আসলে সময় কী? উত্তরে বলা যায়, সময় এমন একটা বিষয়, যা একসঙ্গে সবকিছু করতে দেয় না। আলবার্ট আইনস্টাইনের মতে, অতীত ও ভবিষ্যৎ এক মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়, মানুষের ভ্রম মাত্র। কেউ কেউ বলেছেন সময় বলে কিছু নেই যা অবিরত চলতে থাকে, আবার কারও মতে সময়ের দুটি দিক আছে। নিউটন সময়কে ধ্রুব প্রমাণ করলেও আইনস্টাইন তাকে বলেছেন আপেক্ষিক। এই মহাবিশ্বে সবকিছু যদি স্থির থাকতো তাহলে সময় বা স্থান কিছুই উপলব্ধি করা সম্ভব হতো না। তারমানে গতিশীলতার কারণেই আমরা ‘যুগপৎভাবে’ স্থান ও সময় উপলব্ধি করি।

আলবার্ট আইনস্টাইন সময় জিনিসটাকে আলোর মাধ্যমে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। কোনো বস্তু যত দ্রুত গতিতে চলবে, তার সাপেক্ষে সময় তত স্থির হয়ে থাকবে। আর আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে যেতে পারলে আপনি সময়কেই অতিক্রম করে ফেলতে পারবেন। অর্থাৎ আপনি যত দ্রুত চলবেন, সময় তত ধীরে চলবে। বিশ শতকের প্রথমদিকে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন General theory of Relativity এর মাধ্যমে আমাদেরকে সময়ের আপেক্ষিকতার ধারণা দেন। আলোর গতিতে কোনো বস্তু চলতে পারে না, এটা এখন পর্যন্ত সত্য। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে Universal Speed limit ক্রস করে আলোর গতিতে চলা সম্ভব হবে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ তা করতে পারেনি।

আমাদের পর্যবেক্ষণলব্ধ মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। তবে এটি প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব তত্ত্বের মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স ১৩.৭৫ মিলিয়ন বা ১,৩৭৫ কোটি বছর। কাজেই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্বকে যদি একটা গোলক কল্পনা করা হয় তবে তার ব্যাসার্ধ হবে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। আর সেই দূরত্ব থেকে বর্তমানে যে আলোক বের হচ্ছে তা আমরা কখনোই দেখতে পাবো না। সেই নক্ষত্ররাজির জন্য যেটা অতীত বা বর্তমান, আমাদের জন্য তা সুদূর ভবিষ্যৎ। আর যদি কোনো বস্তু বা সত্তা আলোর গতির থেকে দ্রুত বেগে মহাবিশ্বের প্রান্তরের দিকে ছুটে চলে, তাহলে সে ঘটনা প্রবাহের বিভিন্ন স্তর অতিক্রমকালে, অতীতের সব ঘটনাই সে ঘটমান অবস্থায় জীবন্ত দেখতে পাবে।

সময় এবং আলোর গতি নিয়ে আরেকটি বিষয় আলোচনা করে শেষ করবো। দেখা যাক আলোর গতির থেকে দ্রুতগামী কিছু আছে কি না ?

আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে আলোর থেকে দ্রুতগতির জিনিস রয়েছে। ২০১২ সালে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, পৃথিবী থেকে ২৬ কোটি আলোকবর্ষ দূরে ছায়াপথের কেন্দ্রে ব্ল্যাকহোলের মধ্য দিয়ে একগুচ্ছ গামা রশ্মি বেরিয়ে গেছে, যার গতি আলোর গতি থেকে অনেক বেশি। এ গামা রশ্মি মাত্র ৪ মিনিটে ২৭ কোটি ৯০ লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এ দূরত্ব পার হতে আলোর সময় লাগবে ২৭ মিনিট। এ থেকে প্রমাণিত যে আলোর থেকে দ্রুতগামী জিনিস রয়েছে।

তিরমিজি শরীফের ৩২৩৬ নম্বর হাদিসে বলা আছে, “এক আসমান থেকে অন্য আসমানের দূরত্ব ৫০০ বছরের রাস্তা”। অবৈজ্ঞানিক যুগে এ হাদীস দ্বারা বিজ্ঞানের আবিষ্কারের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আলোর গতিতে পার হতে সময় লাগে ৩০ হাজার বিলিয়ন আলোকবর্ষ বা এক লাখ বছর। তাহলে ৫০০ বছরে এ রাস্তা পার হতে হলে আলোর থেকে দ্রুতগামী জিনিস দ্বারাই কেবল সম্ভব।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের এক বছর পূর্বে ২৭ রজব, সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। বিষয়টি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কতটুকু যৌক্তিক তা আলোচনার চেষ্টা করবো।

Law of Gravity and Law of Relativity বিশ্লেষণ করলে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। আরবি শব্দ ‘বারক’ অর্থ বিদ্যুৎ বা আলো, আর ‘বোরাক’ দ্বারা বিদ্যুৎ থেকে গতিসম্পন্ন কিছুকে বোঝায়। এ ‘বোরাকে’ করে আল্লাহ তার প্রিয় বন্ধুকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদে আকসা অতঃপর ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-এর সহযোগিতায় ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ করান। আর মহাকাশে ভ্রমণ উপযোগী করার জন্যে সফরের পূর্বে তাকে ‘বক্ষ বিদীর্ণ করে জমজম পানি দ্বারা ধৌত করলেন এবং হিকমত ও ইমানে পরিপূর্ণ একটি সোনার পাত্র বুকের মধ্যে ঢেলে তা বন্ধ করে দিলেন।’ (সহি বুখারী ৮১৬৩৬, ৩৩৪২)। এভাবে হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর ‘মে’রাজ’ সংঘটিত হয়। এবং আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে উর্ধ্বে গমনের জন্য উপযোগী করে তোলেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কত সময় পর্যন্ত এ সফর সংঘটিত হলো, আর ঊর্ধ্বাকাশে গমন পর্যন্ত কত সময় বা লাগলো ? আমরা বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি এ সফর ২৭ বছরের ছিল।
এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনের দু’টি আয়াত বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

পবিত্র কুরআনের সূরা হজ্জের ৪৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “প্রকৃতপক্ষে মহান প্রভুর দরবারে একদিন তোমাদের হিসাবে এক হাজার বছরের সমান।”
তাহলে দেখা যায়-
১০০০ বছর = ১ দিন
সুতরাং ২৭ বছর = ( ২৭*২৪*৬০)/১০০০=৩৮.৮৮ মিনিট

আবার সূরা মাআরিজ এর ৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “ফেরেশতাগণ এবং রুহ আল্লাহ্ পাকের নিকট পৌঁছে একদিনে। এ একদিনের পরিমাপ হলো ৫০ হাজার বছরের সমান।”
তাহলে দেখা যায়-
৫০,০০০ বছর= ১ দিন
সুতরাং ২৭ বছর= (২৭*২৪*৬০*৬০)/ ৫০০০০
=৪৬.৬৫৬ সেকেন্ড

এ আয়াত দ্বয় দ্বারা বুঝা যায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর দরবারে পৌঁছে গিয়েছিলেন ৪৬.৬৫৬ সেকেন্ডে আর সেখানে মোট সফর ছিল ৩৮.৮৮ মিনিট।

হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের পথ হিসেবে ৪৬ সেকেন্ড অনেক কম হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে হয়তো ওয়ার্মহোল পদ্ধতিও ব্যবহার করতে পারেন।

‘ওয়ার্ম হোল’ হচ্ছে এমন একটি ক্ষুদ্র সুড়ঙ্গ বা অনেক অনেক আলোকবর্ষ দূরের দুটি ঘটনা বিন্দুকে ও স্পেস ফেব্রিকের সংকোচনের মাধ্যমে খুব কাছাকাছি দূরত্বে নিয়ে আসে। সুতরাং ওয়ার্ম হোলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে আলোর অধিক গতিবেগ ছাড়াই ভবিষ্যৎ পরিভ্রমণ সম্ভব। বিজ্ঞানীরা তাত্ত্বিকভাবে এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করে দিয়েছেন। যদিও এখনও পরিভ্রমণ করার মতো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি। বিজ্ঞানের বহুর্মুখী অগ্রযাত্রার নিরিখে হয়তো একদিন সম্ভব হতে পারে। যিনি এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তিনি তার ইচ্ছার প্রতিফলন তার কুদরতি শক্তির মাধ্যমে ঘটাতে পারেন এটাই স্বাভাবিক। এ সংক্রান্ত আলোচনার পর রাসূল (সাঃ) এর ‘মেরাজ’ সম্পর্কে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। আল্লাহ সকলকে সঠিক বিষয় বুঝার সক্ষমতা দান করুন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

ট্যাগস :

আরও পড়ুন

সর্বশেষ প্রকাশিত

ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব করুন

সম্পাদক: নূরুল আসাদ
প্রকাশক: নাঈম আহমেদ

Copyright © 2025. All Right Reserved.