শামীম মণ্ডল
নেত্রকোনার ছোট্ট একটি গ্রাম ঘিড়ুয়ারী। কৃষক আব্দুস ছালাম ও গৃহীনি বিলকিছ দম্পত্তির সন্তান তামিম নিজের মেধা, পরিশ্রম ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দিয়ে দেশের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন। বাবা আব্দুস ছালাম কৃষি কাজের পাশাপাশি স্থানীয় একটি মসজিদের ঈমামতি করেন। মুজাহেদুল ইসলাম তামিম ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায় কর্মজীন শুরু করেন। বর্তমান হ্যালো কারস নামের জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
তামিম প্রমাণ করেছেন ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’ শৈশবের শতকষ্ট, তবুও থেমে থাকেননি। নেত্রকোনা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘিড়ুয়ারী গ্রামের এক মুসলিম পরিবারের কৃষক বাবা আব্দুস ছালাম-গৃহনী মা বিলকিছ এর ঘরে জন্ম তামিমের। মধ্যবৃত্ত পরিবার হলেও ছোট বেলায় সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কখনও বই কেনার টাকা হয়নি, কখনও বা টিফিনের পয়সা জোটেনি। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও মায়ের চোখে আশার আলো তাকে থামতে দেয়নি।
২০১১ সালে তিনি নেত্রকোনা কোনাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ থেকে বিশেষ কোর্স ‘বি এস সি ইন কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। বর্তমানে কর্মজীবনের পাশাপাশি শখের বসে অতিশ দিপংকর ইউনিভার্সিটি অফ সাইন্স এন্ড টেকনোলজি থেকে এল এল বি (অনার্স) ২য় বর্ষে অধ্যয়ন করতেছি। যেন নিজেকে আরও বহুমাত্রিক ভাবে গড়ে তুলতে পারেন।
কর্মজীবনের ফ্রিল্যান্সিংয়ে প্রথম পদচারণা। ছাত্রজীবনেই তিনি ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন। তখন বয়স মাত্র কুড়ির কোঠায়ও পৌঁছায়নি। প্রথম মাসে উপার্জন ছিল মাত্র ১৫০০ টাকা। তবে অনলাইন মার্কেটপ্লেস থেকে প্রথম আয় করেন ৩৫.০১ মার্কিন ডলার, যা তৎকালীন বাজারে প্রায় ২৬০২ টাকা। এই সামান্য টাকাই তার জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ‘তখনই বুঝেছিলাম আমি পারি’ বলেন তামিম। সময়ের ব্যবধানে সেই ক্ষুদ্র আয় আজ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এখন তার একদিনের আয় তখনকার কয়েক মাসের সমান।
তামিম এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে করপোরেট জগৎ
শিক্ষাজীবনের শেষ দিকে জীবিকার তাগিদে তিনি যোগ দেন শাহীন শিক্ষা পরিবারে। মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু এখানেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. মাসুদুল আমিন শাহীন হয়ে ওঠেন তার জীবনের দিকনির্দেশক।
তামিম বলেন, ছাত্রজীবনে যখন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে ছিলাম, তখন শাহীন স্যার ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তাঁর কারণেই আমি আমার কর্মজীবনের প্রথম মঞ্চটা পেয়েছি।” কর্মদক্ষতা ও সততার কারণে অল্প সময়েই আমাকে হেড অব আইটি পদে উন্নীত করেন। বেতন বাড়ে ১২ হাজার টাকায়। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি।
‘হ্যালো কারস’-এ নতুন দিগন্ত :
নিজের দক্ষতা ও নিরলস পরিশ্রমের কারণে তিনি পরবর্তীতে সুযোগ পান শাহীন শিক্ষা পরিবারে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ‘হ্যালো কারস’ নামের একটি শীর্ষস্থানীয় গাড়ি বিক্রয় ও সেবাদান প্রতিষ্ঠানে। ধীরে ধীরে এখানেও নিজের জায়গা তৈরি করেন। আজ তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর জেনারেল।
বর্তমানে হ্যালো কারস শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পাচ্ছে। সৌদি আরব, ভারত, থাইল্যান্ড ও জাপানসহ চারটি দেশে রয়েছে তামিমের কাজের সংযোগ। তাঁর অধীনে এখন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। তিনি বলেন, চাকরী জীবনের আমি গড়ে তুলেছি বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়া ও টিকেট ক্রয় বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ‘তাজওয়ার এয়ারওয়েস’ ও কৃষি ভিত্তিক স্টার্টআপ ট্রাস্ট ফার্মার। যেখানে অনেকে কর্মরত রয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলার ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন শাহীন শিক্ষা পরিবার এর চেয়ারম্যান মো. মাসুদুল আমিন শাহীন।
তামিম বলেন, ‘এক সময় ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে আজ এত বড় দায়িত্বে আসাটা সহজ ছিল না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, কাজ আর সততার বিকল্প নেই।’
প্রত্যেক সফল মানুষের পিছনে অনুপ্রেরণার কিছু মানুষ থাকে, যারা নিরবে পথ দেখান। হ্যালো কারস এর চেয়ারম্যান মো. মাসুদুল আমিন শাহীন তামিমের জীবনে এমনই একজন। তার পাশাপাশি উল্লেখ্যযোগ্য অনুপ্রেরণার উৎস জাকারিয়া মাসুদ পাপপু, মো. জয়নাল আবেদীন ও শাহীন শিক্ষা পরিবার পরিচালক (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং) মো. মারুফ হোসেন।
তামিম বলেন, ‘এই মানুষগুলোর সহযোগিতা ও পরামর্শ ছাড়া আমি আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না। তাঁরা সব সময় আমাকে ইতিবাচক ভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন।’ সমালোচনা নয়, কাজ দিয়ে উত্তর দিতে হয়। আমার পিছনে সমালোচকদের অভাব ছিল না। কেউ বলেছে, ‘এতে কিছু হবে না’, কেউ বলেছে, ‘গ্রামের ছেলে শহরে টিকতে পারবে না’। কিন্তু তিনি জানতেন, কঠোর পরিশ্রমই একমাত্র উত্তর। তিনি হাসিমুখে বলেন, ‘সমালোচকরা এখনো পেছনে পড়ে আছে। আমি তাদের ভুল প্রমাণ করেছি আমার কাজ দিয়ে।’ আজ আমি প্রমাণ করেছি গ্রামের সাধারণ ছেলে হয়েও বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব, যদি ইচ্ছা শক্তি দৃঢ় হয়।
তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা। তামিমের গল্প এখন দেশের অনেক তরুণের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তার কথায়, ‘জীবনে সফল হতে হলে বড় ডিগ্রি বা ধনসম্পদ নয়, দরকার স্বপ্ন দেখার সাহস আর তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার মনোভাব।’
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের সৃজনশীলতা এবং ডিজিটাল দক্ষতা। তাই তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘নিজেকে কখনো ছোট মনে কোরো না। তোমার পরিশ্রমই তোমার পরিচয়। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’
গ্রামের ছোট্ট ঘর থেকে শুরু করে করপোরেট দুনিয়ার চূড়ায় উঠার গল্পটা কোনো অলৌকিকতা নয়। এটা এক মানুষের নিরলস পরিশ্রম, সততা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
মুজাহেদুল ইসলাম তামিমের জীবন কাহিনি আমাদের শেখায়। অভাব কোনো বাধা নয়, সমালোচনা কোনো প্রতিবন্ধক নয়,আর স্বপ্নই মানুষকে গড়ে তোলে তার প্রকৃত রূপে। তিনি নিজেই বলেন, ‘আমি বারবার প্রমাণ করতে চেয়েছি, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’ স্বপ্নের সমান বড় মানুষ: কৃষকের ছেলেকে ‘ডিরেক্টর জেনারেল’ বানিয়েছে ইচ্ছাশক্তি।


